তুরস্কে আগাম নির্বাচন: চেঞ্জ মেকারের রাজনীতি

31495326_2157628084495780_8915544098593570816_nতুরস্কে আগাম নির্বাচন: চেঞ্জ মেকারের রাজনীতি
-হাফিজুর রহমান_আংকারা

গত ১৮ এপ্রিল তুরস্কে অাগাম নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন নিয়ে কিছু লিখবো লিখবো বলে চেষ্টা করছি কিন্তু ফুরসত মিলছে না। পাশাপাশি আমিও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য অবশ্য কিছুটা সময় নিচ্ছিলাম বিশেষ করে আব্দুল্লাহ গুলের প্রার্থীতার ব্যপারটাতে। সবমিলে আজকের এই লেখা:

এক- আচমকা নির্বাচনের ঘোষণা ও দ্বিধাদ্বন্দে বিরোধী দল,

সিরিয়া ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরন সহ নানা ইস্যুতে তুরস্কের জন্য আগামী দিনগুলো চ্যালেঞ্জের হবে। আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইসরাইলসহ পশ্চিমা জোট তুরস্কের ক্রমবর্ধমান এগিয়ে যাওয়াকে রুখতে সব ধরনের কলকাঠি সবসময়ই নাড়ে অদূর ভবিষ্যতে যা আরো বাড়বে। ইতিমধ্যে তুরস্কের অর্থনীতিকে অচল করতে সবধরনের চক্রান্ত চলছে। এদিকে তুরস্কে গত ১৫ বছরে বিরোধী দলগুলো এরদোয়ান ও একে পার্টিকে সবধরনের চেষ্টা সত্ত্বেও কোন নির্বাচনেই হারাতে পারেনী, স্বভাবতই তারা অতিষ্ঠ! কয়েকদিন আগেও তারা অগ্রিম নির্বাচন চাইত বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল সেকু্লারিস্ট ও বাম আদর্শের দল সিএইচপি (জেহেপে)। অবশ্য তাদের অগ্রিম নির্বাচন চাওয়াটা অনেকটা বিরোধী দলের চিরাচরিত ফরমালিটির অবদার ছিল তাই হয়তো তারা চিন্তাও করতে পারেনী যে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এমন একটা খেলা খেলবেন!

পশ্চিমা মিডিয়া, সেক্যুলার বুদ্ধিজীবি ও কখনো কখনো গুটিকয়েক ইসলামিস্টরা (!) এরদোয়ানকে একনায়কতন্ত্রী হিসেবে আখ্যা দিতে চান। তাদের জন্য এখানে একটা লাইন উল্লেখ করতেই হচ্ছে। আর তা হল, একনায়কতন্ত্রী ও স্বৈরাচার সরকাররা সবসময়ই নির্বাচনকে ভয় পান, ভয় পান জনগনের কাছে জনপ্রিয়তা যাচাইকে। কিন্তু এরদোয়ান পুরোপুরিই তার ব্যতিক্রম। তিনি সবসময়ই বলেন, আমাদের জনগন যতদিন চায় ততদিনই আমরা ক্ষমতায় থাকবো। আর সে জন্যই গত ১৫ বছরে একে পার্টি ১২ বার ভোটে যাওয়ার মাধ্যমে জনপ্রিয়তা যাচাই করেছে। আর গত কয়েকবছর ধরে প্রায় প্রতিবছরই একটানা একটা নির্বাচন হচ্ছেই।

আচ্চা, থিউরিটিকাল বিল্লেষণ বাদ দেই। আবার ফিরে যাই নির্বাচনে। এরদোয়ান আচমকা নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পর বিরোধী দলগুলো অনেকটা হতবম্ব হয়ে যায় ! নির্বাচনে নাও করতে পারছে না কারণ কিছুদিন আগে তারাই নির্বাচন চাইত আবার খুব খুশিও না কারন তারা আগামী বছর ভেবেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। আর তাই হতবম্ব এই বিরোধী দলগুলো এমন কিছু কাজ করছে যা ভোটের রাজনীতিতে তাদের জন্য কেবল নেগেটিভই হচ্ছে। এমনই কয়েকটা কাজ হল:

১. বিরোধী দল এরদোয়ানের মোকাবেলায় যোগ্য প্রার্থী খুজে পাচ্ছেনা:
এবার প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন একসাথে হবে (২৪ জুন) ও জোটবদ্ধ হবে। ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় বিরোধী দল তথা জাতীয়তাবাদী দল (এমএইচপি/ মেহেপে) একে পার্টির সাথে জোটের ঘোষণা দিয়েছে। স্বভাবতই এ্রই জোটের প্রার্থী প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। কিন্তু বিরোধী জোট এরদোয়ানের মোকাবেলায় শক্ত কোন প্রার্থী খুজে পাচ্ছে না। প্রথমত: এরদোয়ানের বিরুদ্ধে ন্যাচারাল প্রার্থী হওয়ার কথা প্রধান বিরোধী দলের নেতার। কিন্তু তিনি প্রার্থী হতে চাচ্ছেন না। উনি হয়তো মনে করছেন প্রার্থী হলে উনার রাজনীতি এখানেই শেষ হয়ে যাবে। কারন তার দলের (সিএইচপি) ভোটের চেয়ে তার ব্যক্তিগত ভোট কম আর পাশাপাশি উনি (দলীয় প্রধান হিসেবে) একে পার্টি/এরদোয়ানের বিরুদ্ধে নয়বার হেরেছেন। আর তাই প্রধান বিরোধী দলের নেতা চাচ্ছিলেন/ চাচ্ছেন কারো মাথায় কাঠাল ভেঙ্গে খেতে। উনার সাথে যোগ হয়েছে তুরস্কের ইসলামী দল সাদাত পার্টির প্রধান তেমেল সাহেব। তুরস্কে ভোটের রাজনীতিতে সাদাত পার্টির ভোট ১-২% হলেও তেমেল সাহেব বেশ বর্ষিয়ান রাজনৈতিক নেতা পাশাপাশি উনি নতুন দলীয় প্রধান হওয়ার কারনে কিছুটা ভালো ইমেজ এখনো আছে। আর এ জোটে যোগ হয়েছে নতুন সৃষ্টি হওয়া রাজনৈতিক দল (ইয়ি/ গুড পার্টি) যেটা তৃতীয় তথা জাতীয়তাবাদী দল থেকে ভেঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী এই জোট চেয়েছিল তৃতীয় কাউকে প্রার্থী করতে এজন্য তারা যোগাযোগ করতে থাকে সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ গুলের সাথে। যা কিছুটা একে পার্টিকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল বলতে হবে। এটা নিয়ে কয়েকদিন বেশ গরম ছিল মিডিয়া। কিন্তু উনি সর্বশেষ না করে দেওয়ায় এ পরিকল্পনা ভেস্তে যায় (আব্দুল্লাহ গুলের প্রার্থীতা ও এর প্রভাব কি হতে পারতো তা নিয়ে পরবর্তী পর্বে লিখবো)।

তুরস্কে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে হলে সংসদে সংসদীয় গ্রুপ থাকতে হয় (২০ জন এমপি হলে সংসদে গ্রুপ গঠন করা যায়) অথবা প্রার্থীতার পক্ষে ১ লক্ষ ভোটারের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। বিরোধী দলের প্রধান দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে হয়তো চিন্তা করেছিল নতুন সৃষ্টি হওয়া দল ইয়ি/গুড পার্টির প্রধানকে সমর্থন দিবে। যেহেতু নতুন এই দলের সংসদীয় গ্রুপ নেই তাই প্রধান বিরোধী দল নতুন পার্টিকে ১৫ জন এমপি প্রদান করে যাতে তারা সংসদীয় গ্রুপ গঠন করতে পারে এবং প্রার্থী হতে কিংবা নির্বাচন করতে কোন সমস্যা না হয়। উল্লেখ্য, তাদের দলে পাঁচজন এমপি আগে থেকেই ছিল যারা তৃতীয় দল থেকে পদত্যাগ করে নতুন দল গঠনের সময় যোগ দিয়েছে।

প্রধান বিরোধী দলের এই ১৫ জন এমপি প্রদানের ব্যাপারটা তুরস্কে রীতিমত স্ক্যান্ডালে পরিনত হয়। তাতে প্রধান বিরোধী দল ও নতুন সৃষ্টি হওয়া দল দুটোরই জনপ্রিয়তা কমেছে এবং প্রশ্নের সম্মুখিন হচ্ছে। নতুন দলের প্রধান প্রার্থী হিসেবে যতটা শক্তিশালী ছিল আমার মতে এ ঘটনার পর তার জনপ্রিয়তা আরো কমেছে। এদিকে এই ঘটনায় প্রধান বিরোধী দলেও নীতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

সবমিলে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারটায় বিরোধী দল এখনো দ্বিধাবিভক্তে।

(চলবে……….)

 
 

Send Comment